জামায়াত-শিবিরসহ কয়েকটি ধর্মভিত্তিক দলের নেতা-কর্মীরা গতকাল শুক্রবার সিলেটের কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে হামলা চালিয়ে ভাঙচুর করেছেন। এ সময় পুলিশের গুলিতে এক ব্যক্তি নিহত হয়েছেন। গুলিবিদ্ধ হয়েছেন অন্তত ২৭ জন।
শহীদ মিনারে ভাঙচুরের পর হামলাকারীরা এর আশপাশের একটি এটিএম বুথ, অন্য একটি ব্যাংক ভাঙচুর করে ও পুলিশের গাড়িতে আগুন দেয়। এর প্রতিবাদে ছাত্রলীগের বিক্ষোভ মিছিল থেকে গতকাল সন্ধ্যা পর্যন্ত জামায়াত-শিবির নিয়ন্ত্রিত কয়েকটি প্রতিষ্ঠানে ভাঙচুর ও আগুন দেওয়া হয়।
শহীদ মিনারে ভাঙচুরের সময় ঘটনাস্থল থেকে পুলিশ অন্তত ৬৭ জনকে আটক করেছে। সন্ধ্যার পর বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) সদস্যরা শহরে টহল দিতে শুরু করেছেন।
পুলিশ ও প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, গতকাল জুমার নামাজের পর নগরের বিভিন্ন মসজিদ থেকে খণ্ড খণ্ড মিছিল বের হয়। এসব মিছিল কোর্ট পয়েন্টে গিয়ে মিলিত হয়ে ‘তৌহিদি জনতা’ ব্যানার নিয়ে সমিঞ্চলিত মিছিল বের করে। কয়েক হাজার লোকের মিছিলটি কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার অতিক্রম করার সময় মিছিলকারীদের একটি অংশ শহীদ মিনারের গণজাগরণ মঞ্চে ভাঙচুর করে আগুন ধরিয়ে দেয়। আরেকটি অংশ শহীদ মিনারের সীমানাপ্রাচীর ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করে। তারা শহীদ মিনারের বেদিতে থাকা পুষ্পস্তবক পদদলিত করে আগুন ধরিয়ে দেয় ও মূল বেদি গুঁড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে। এ সময় কর্তব্যরত পুলিশ তাদের ধাওয়া করলে দুই পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ বেধে যায়। পুলিশ প্রথমে লাঠিপেটা ও কাঁদানে গ্যাসের শেল নিক্ষেপ করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা করে। এ সময় মিছিলকারীরা পুলিশের একটি গাড়িতে আগুন দিয়ে এইচএসবিসি ব্যাংকের এটিএম বুথ ও ট্রাস্ট ব্যাংক ভবনের একাংশ ভাঙচুর শুরু করে। পুলিশ তখন গুলি ছোড়ে। গুলির শব্দে মিছিলকারীরা আরও সহিংস হয়ে ওঠে। শুরু হয় পাল্টাপাল্টি ধাওয়া। এতে শহীদ মিনার থেকে জিন্দাবাজার মোড় ও চৌহাট্টা থেকে আম্বরখানা মোড় রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। এ সময় রাস্তায় অর্ধশতাধিক লোককে পড়ে থাকতে দেখা যায়। গুলিবিদ্ধ হয়ে রাস্তায় পড়ে থাকা অবস্থায় এক ব্যক্তি মারা যান। পুলিশ তাঁকে উদ্ধার করে সিলেট ওসমানী মেডিকেল কলেজের মর্গে পাঠায়। পরে রাস্তায় পড়ে থাকা গুলিবিদ্ধসহ অন্তত ২৭ জনকে উদ্ধার করে ওসমানী হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। তাঁদের মধ্যে ১৭ জনকে আটক দেখানো হয়েছে। পরে কোর্ট পয়েন্ট থেকে আম্বরখানা পর্যন্ত এলাকায় পুলিশ অভিযান চালিয়ে আরও ৬০ জন আটক করলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসে।
নিহতের নাম মোস্তফা মোরশেদ তাহমিদ (১৮)। সে সিলেট এমসি কলেজের দ্বাদশ শ্রেণীর ছাত্র। বাসা সিলেট নগরের হাউজিং এস্টেটে। মর্গে নিহতের বাবা নুরুল মোস্তফা দাবি করেন, তাঁর ছেলে কোনো রাজনীতিতে জড়িত নয়।
সিলেট কোতোয়ালি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আতাউর রহমান জানান, মিছিলে থাকা জামায়াত-শিবিরের নেতা-কর্মীরা উসকানি দিয়ে পরিকল্পিতভাবে শহীদ মিনারে ভাঙচুর চালান।
বিকেল তিনটার দিকে ছাত্রলীগ ও যুবলীগ তাৎক্ষণিক প্রতিবাদ মিছিল বের করে। এই প্রতিবাদে অনেকেই শামিল হয়। এই মিছিল থেকে জামায়াত-নিয়ন্ত্রিত নগরের বিপণিবিতান আল হামরা, সুরমা টাওয়ার, রেটিনা কোচিং সেন্টার, উইমেন্স মেডিকেল কলেজে ভাঙচুর চালানো হয়। সুরমা টাওয়ারের সামনে সংবাদকর্মীদের মোটরসাইকেলেও আগুন দেওয়া হয়। বিকেল পাঁচটার দিকে তালতলায় ইসলামী ব্যাংকের বুথ ভাঙচুর করা হয় এবং ব্যাংকের আম্বরখানা শাখার বাইরে থেকে আগুন দেওয়া হয়। পরে ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা আগুন নেভান।
পুলিশ সূত্র জানায়, গুলিবিদ্ধ ২৭ জনের মধ্যে ১৭ জনকে আটক দেখানো হয়েছে। তাদের ওসমানী মেডিকেলে ভর্তি করা হয়েছে। এদের ছয়জন সিলেট শহরের। অন্যরা সিলেটের বিভিন্ন উপজেলার বাসিন্দা। এদের অধিকাংশই জামায়াতের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত বলে পুলিশ জানায়। হাসপাতালে মর্গে কর্তব্যরত পুলিশ জানায়, মৃত ব্যক্তির বুকের ডান পাশে গুলি লেগেছে।
সিলেট মহানগর পুলিশের কমিশনার নিবাস চন্দ্র মাঝি জানান, সন্ধ্যার পর থেকে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর টহলের পাশাপাশি বিজিবি টহল দিচ্ছে।
আজ ‘সর্বদলীয় সমাবেশ’: শহীদ মিনার ভাঙচুরের খবর পেয়ে রাত পর্যন্ত ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলসহ প্রগতিশীল বিভিন্ন দলের নেতা-কর্মী ও গণজাগরণ মঞ্চের সংগঠকেরা শহীদ মিনারে গিয়ে এ ঘটনার নিন্দা জানান। মেয়র বদরউদ্দিন আহমদ কামরান শহীদ মিনারে সমবেত লোকজনের উদ্দেশে বক্তব্য দেন। তিনি আজ শনিবার সকালে ‘সর্বদলীয় সমাবেশ’ আহ্বান করেন।
by protomALO